শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি। ভিক্ষা করে নয়, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চেয়েছিল নাহিদ। তাই ছোট্ট একটি দোকানের স্বপ্ন নিয়ে মায়ের হাত ধরে প্রায়ই ছুটে আসত টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। অবশেষে সেই স্বপ্ন পুরন করলেন,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব হাসান।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নাহিদের হাতে একটি দোকান তুলে দেওয়া হয়। নিজের একটি দোকান পাওয়ার পর নাহিদের মুখে যে আনন্দ ফুটে ওঠে, তা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে। দীর্ঘদিনের একটি ছোট্ট স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই বাস্তবে রূপ নেয় তার।
জানা যায়, উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের চর তাড়াই এলাকার নাজির উদ্দিন-শাহানাজ বেগম দম্পতির একমাত্র সন্তান নাহিদ। মাত্র ৭ বছর বয়সেই টাইফয়েডের করাল থাবায় ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যায় তার একটি হাত ও একটি পা। একমাত্র সন্তানকে ঘিরে বাবা-মায়ের যে স্বপ্ন ছিল, মুহূর্তেই যেন তাতে নেমে আসে অন্ধকার। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নাহিদের পথচলা থামাতে পারেনি। প্রতিকূলতাকে জয় করে সে এসএসসি পাস করেছে।
স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে না পারলেও নাহিদের মনে ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কারও করুণার পাত্র হয়ে নয়, নিজের সামর্থ্যে বাঁচতে চেয়েছে সে। সেই ইচ্ছা থেকেই একদিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব হাসানের কাছে নিজের ছোট্ট আবদারটি জানায় নাহিদ—একটি ছোট দোকান হলে সে নিজেই কিছু করতে পারবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে, আর জীবনের প্রয়োজন মেটাতে কারও কাছে হাত পাততে হবে না।
নাহিদের সেই স্বপ্নের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব হাসান। পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে নাহিদের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করা হয়।
দোকান পেয়ে নাহিদ বলেন, সে ভিক্ষা করতে চায় না। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে স্বাবলম্বী হতে চায়। দোকানটি তার সেই পথচলার সুযোগ করে দিয়েছে।
নাহিদের মা শাহানাজ বেগম বলেন, ছেলের ইচ্ছা ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। সেই স্বপ্ন পুরনের আনন্দ যে চোখে জল এনে দেয় সেটা নাহিদকে দেখে বুঝলাম। আমি অবাক চোখে অনেকদিন পর নাহিদকে হাসতে দেখেছি।
দোকান বন্ধ করতে করতে গল্পে গল্পে তিনি মায়ের কাছে বলেছেন, সে অনেকদিন পর অনেক খুশি হয়েছে। তার চোখে মুখে বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস দেখে মায়ের চোখেও জল চলে আসে।
ছেলের এই স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় নাহিদ ও তার মা উপজেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, “নাহিদের জন্য আমরা যতটুকু করেছি, তা আমাদের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই করেছি। নাহিদ তার মাকে সঙ্গে নিয়ে একাধিকবার আমাদের কাছে এসেছে এবং তার কষ্টের কথা জানিয়েছে। পরে আমরা তার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, নাহিদ সত্যিই অসহায় এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, নাহিদ ভিক্ষা করতে চায় না; সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। কারও দয়ার ওপর নির্ভর না করে নিজে কাজ করে উপার্জন করতে চায়। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ যখন নিজের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে চায়, তখন তাকে সহযোগিতা করা আমাদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ইউএনও স্যারের নির্দেশনায় নাহিদকে একটি দোকান উপহার দেওয়া হয়েছে।
নাজমুল হাসান বলেন, নাহিদ যেন এই দোকানের মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং স্বাবলম্বী হয়ে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের আওতাধীন সরকারি সহযোগিতা ও উদ্যোগগুলো আরও বেশি মানুষের কাছে, বিশেষ করে প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই।
নাহিদের হাসি আমাদের সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
নাহিদের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সহায়তার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগটি স্থানীয়দের মধ্যেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের এমন উদ্যোগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভিক্ষার ওপর নির্ভরশীল না করে কর্মমুখী ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply